১২:৪৫ অপরাহ্ন

সোমবার, ১২ অক্টোবর , ২০২৬
ads
ads
শিরোনাম
  • হোম
  • অনাবাদী জমিতে আদা চাষে স্বাবলম্বী গৃহিণীরা
ads
প্রকাশ : অক্টোবর ১২, ২০২৬ ৯:১৫ পূর্বাহ্ন
অনাবাদী জমিতে আদা চাষে স্বাবলম্বী গৃহিণীরা
কৃষি বিভাগ

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বিকেনগর ইউনিয়নের খানকান্দি গ্রাম। আগে যে বাড়ির উঠোন বা আঙিনার ছায়াঘেরা অংশটুকু বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকত, আজ সেখানে সারি সারি বস্তায় ঝুলছে সবুজ আদা গাছ।

স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা আইরিন আক্তার ছায়াযুক্ত অনাবাদী জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেছিলেন এই উদ্যোগ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (এসডিএস) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর কারিগরি ও কৃষি সহায়তায় তিনি প্রাথমিকভাবে ২০০টি বস্তায় আদা চাষ শুরু করেন। নিজের তৈরি জৈব সার এবং সংস্থার দেওয়া বীজ-কীটনাশক ব্যবহার করায় উৎপাদন খরচ ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়।

নারী উদ্যোক্তা আইরিন আক্তার বলেন, পরিবারের প্রয়োজনীয় আদার চাহিদা তো মিটবেই, আশা করছি সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকার আদা বিক্রি করতে পারব।

একই গ্রামের আরেক নারী ঝর্ণা আক্তার ২৫০টি বস্তায় আদা চাষ করেছেন। গৃহস্থালি কাজের ফাঁকেই সামান্য পরিচর্যা করে তিনি দেখছেন তিনগুণ লাভের মুখ। আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে চাষ করার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

আইরিন ও ঝর্ণার সাফল্য দেখে জাজিরার বিকেনগর এলাকার অন্তত ১০ জন নারী উদ্যোক্তা এখন এই আধুনিক প্রযুক্তিতে আদা চাষে যুক্ত হয়েছেন। দেখতে ক্ষুদ্র হলেও একেকটি বস্তা থেকে প্রায় ১ থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত আদা পাওয়া যাচ্ছে, যা গ্রামীণ পরিবারগুলোতে নতুন আয়ের উৎস তৈরি করেছে।

জাজিরা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুসলিমা জাহান লিনিয়া জানান, বাড়ির আঙিনায় অবহেলায় পড়ে থাকা জমি ব্যবহার করে নারীরা কেবল নিজেদের আদার চাহিদা পূরণ করছেন না, বরং তা বিক্রি করে পরিবারকে আর্থিকভাবে মজবুত করছেন। এটি গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন ও স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখছে।

লালমাটি থেকে চরাঞ্চলের নতুন সম্ভাবনা

বস্তায় আদা চাষের এই সফলতার হাওয়া কেবল জাজিরাতেই সীমাবদ্ধ নেই; ছড়িয়ে পড়েছে টাঙ্গাইলের মধুপুর এবং জামালপুর জেলায়ও।মধুপুরের পাহাড়ি ও লালমাটির এলাকায় সাধারণত আনারস ও কলা চাষের আধিক্য দেখা যায়। তবে উঁচু জমি এবং বাড়ির আঙিনায় ছায়াযুক্ত স্থানে বস্তায় আদা চাষ সেখানকার কৃষকদের কাছে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। মধুপুরের বিষমুক্ত ও প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ মাটিতে বস্তায় আদা চাষ করে কৃষকরা কম খরচে দ্বিগুণ ফলন পাচ্ছেন।

জামালপুরের নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চল

জামালপুরের বন্যাপ্রবণ ও চরাঞ্চলে যেখানে বর্ষাকালে নিচু জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়, সেখানে বস্তায় আদা চাষ কৃষকদের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। উঁচু ভিটা বা আঙিনায় বস্তা রেখে সহজে সরিয়ে নেওয়া যায় বলে বন্যার রূপ পরিবর্তন করলেও ফসলের কোনো ক্ষতি হয় না। জামালপুরের অনেক নারী এখন হাঁস-মুরগি পালনের পাশাপাশি এই সহজ আদা চাষকে তাদের বাড়তি আয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

বস্তায় আদা চাষ কেন এত জনপ্রিয়

সনাতন পদ্ধতির তুলনায় বস্তায় আদা চাষের বেশ কিছু অনন্য সুবিধা রয়েছে, যা একে দিন দিন জনপ্রিয় করে তুলছে বলে মনে করেন জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলম শরিফ খান। তিনি জানান, অনাবাদী জায়গা ব্যবহার করে বাড়ির আঙিনা, ছাদে বা ছায়াযুক্ত অনাবাদী জায়গায় এটি সহজেই করা যায়। এছাড়া রোগবালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও সুরক্ষিত থাকে এবং কম খরচ ও সহজে পরিচর্যা করা যায়। আর ফলনও হয় বেশি।

অর্থনীতি ও জাতীয় প্রভাব: বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পথ

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রতি বছর আদার একটি বড় ঘাটতি থাকে, যা মেটাতে চীন বা ভারত থেকে আদা আমদানি করতে হয়। এ বিষয়ে শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির কৃষি কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, নারীদের স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে আদার আমদানি নির্ভরতা কমাবে। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

আগামীর প্রত্যাশা

যেখানে একসময় গ্রামীণ নারীদের কেবল গৃহস্থালি কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ভাবা হতো, সেখানে আজ বস্তায় আদা চাষের মাধ্যমে তারা হয়ে উঠছেন সফল উদ্যোক্তা। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সঠিক প্রশিক্ষণ, মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ এবং আর্থিক ঋণ সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা গেলে জাজিরা, মধুপুর ও জামালপুরের মতো দেশের প্রতিটি উপজেলায় এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।

বাড়ির আঙিনার ছোট একখণ্ড সবুজ জায়গা আজ কেবল সৌন্দর্যই ছড়াচ্ছে না, বুনে দিচ্ছে নতুন দিনের স্বাবলম্বী বাংলাদেশের গল্প।

শেয়ার করুন

ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ads

ফেসবুকে আমাদের দেখুন

ads

মুক্তমঞ্চ

scrolltop