৪:৩০ পূর্বাহ্ন

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে , ২০২৬
ads
ads
শিরোনাম
প্রকাশ : ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫ ৯:২৬ পূর্বাহ্ন
পটুয়াখালীতে সার সংকটে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় তরমুজ চাষিরা
কৃষি বিভাগ

পটুয়াখালী জেলায় তরমুজ আবাদ মৌসুম শুরু হতে না হতেই আবারও সার সংকটে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তরমুজ চাষিরা। পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলার বাজারসহ স্থানীয় বাজারে সারের সরবরাহ কম থাকায় অধিক দাম দিয়ে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। এতে তরমুজের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তরমুজ চাষিরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালীর ৮টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে মোট ২৭ হাজার ৩২৬ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নভেম্বর মাসের শেষ দিক থেকেই কৃষকেরা জমি প্রস্তুত ও বীজ রোপণের কাজ শুরু করেছেন। তবে মৌসুমের শুরুতেই সারের সংকট দেখা দেওয়ায় চাষাবাদ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে।

কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের জন্য জেলার চাহিদা অনুযায়ী টিএসপি, ইউরিয়া ও ডিএপি সারের বরাদ্দ চাওয়া হলেও সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ২৪২ মেট্রিক টন। এর ফলে বাজারে এসব সারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আবার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন চাষিরা।

গত বছর পটুয়াখালী জেলায় ২৭ হাজার ৩২৬ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছিল। এতে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৮ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩২ মেট্রিক টন তরমুজ। ন্যূনতম ৪০ টাকা কেজি দরে যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। জেলার অর্থনীতিতে তরমুজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল হওয়ায় চলতি মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়বে চাষি থেকে শুরু করে স্থানীয় বাজার পর্যন্ত।

সরেজমিনে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি একর জমিতে তরমুজ চাষে টিএসপি, ইউরিয়া, এমওপি ও ডিএপি মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ বস্তা সার প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেকেই প্রয়োজনের অর্ধেক সারও সংগ্রহ করতে না পারায় উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা।

রাঙ্গাবালী উপজেলার চর নজির এলাকার চাষি মাসুদ ফকির বলেন, এবার আমি ৩ একর ২২ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করছি। আমার কমপক্ষে ৪০ বস্তা সারের দরকার হলেও কিনতে পেরেছি মাত্র ১০ বস্তা সার। তাও আবার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়েছে। সময়মতো সার না দিতে পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলার বানাতিপাড়া এলাকার চাষি রুহুল আমিন জানান, তারা ১০ জন কৃষক মিলে প্রায় ৫০ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের মোট ৫০০ বস্তা সারের প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিনতে পেরেছি মাত্র ১০০ বস্তা। গত এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন দোকানে ঘুরেও প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাইনি। এভাবে চললে উৎপাদন ব্যাহত হবে। আর উৎপাদন ব্যাহত হলে আমাদের লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে।

পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামের তরমুজ চাষি মহিব্বুল্লাহ আজাদ বলেন, সার কিনতে গেলে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলারদের কাছ থেকেই তারা ঠিকমতো সার পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ সুযোগ বুঝে বেশি দাম চাইছেন। এতে আমরা বিপাকে পড়েছি।

এদিকে দুমকি, বাউফল ও মির্জাগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন চাষি একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। বাউফল উপজেলার এক কৃষক জানান, মৌসুমের শুরুতে সার না পেলে পরে জমিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়া সম্ভব হয় না। এতে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলন কমে যায়।

কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক চাষিই তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ধাপে ধাপে সার ব্যবহার করছেন না। অধিক ফলনের আশায় একসঙ্গে বেশি সার প্রয়োগের প্রবণতা রয়েছে। আবার ভবিষ্যতে সংকটের আশঙ্কায় মৌসুমের শুরুতেই বেশি সার সংগ্রহে নেমে পড়ছেন অনেকে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, “বাউফলে বর্তমানে সারের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। সার সঙ্কটের বিষয়ে আমরা এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা তথ্য পাইনি। তবে কেউ যদি কৃত্রিমভাবে সংকট সৃষ্টি করে কৃষকদের হয়রানি করার চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি।”

এ বিষয়ে পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আমানুল ইসলাম বাসসকে বলেন, “জেলার কোথাও সার সংকট রয়েছে—এমন নির্দিষ্ট তথ্য এখনো আমার কাছে আসেনি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হলে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”

তিনি বলেন, তরমুজ মৌসুমের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সরবরাহ বাড়ানো হলে বড় ধরনের সংকট থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন।

চাষিরা বলছেন, দ্রুত বাজারে সার সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে তরমুজ উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সময়মতো প্রয়োজনীয় সার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫ ৯:২৬ পূর্বাহ্ন
কমলা চাষে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছেন শিবচরের উদ্যোক্তা রাসেল
কৃষি বিভাগ

মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া মৃধাকান্দি এলাকায় কমলা চাষে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা রাসেল হোসেন।

দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে বাবার গড়ে তোলা শখের বাগানকে কেন্দ্র করে তিনি এখন নিজ এলাকার কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

বিদেশফেরত অনেক যুবক যেখানে কর্মসংস্থানের অভাবে দুশ্চিন্তায় ভোগেন, সেখানে রাসেল নিজের উদ্যোগে একটি সফল উদাহরণ তৈরি করেছেন।

ছয় বছর আগে রাসেলের বাবা শওকত হোসেন দেড় বিঘা জমিতে ৬০টি ছোট জাতের কমলার চারা রোপণ করেছিলেন। প্রথমদিকে গাছে উল্লেখযোগ্য ফলন না আসায় বাগানটি তেমন গুরুত্ব পায়নি।

তবে রাসেল দেশে ফিরে ২০২১ সালের শেষ দিকে বাগানের দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিবর্তন আসে। তিনি ইন্টারনেটে কমলা চাষ বিষয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করেন, কৃষি বিভাগের কাছ থেকেও পরামর্শ নেন এবং আধুনিক পদ্ধতিতে গাছের পরিচর্যা শুরু করেন। সার-সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন, ছাঁটাই ও মাটির উন্নয়ন সবকিছু নতুন পরিকল্পনায় করা হয়।

২০২৪ সালে কমলা  বাগানে আসে ব্যাপক ফুল। মৌসুম শেষে গাছগুলোতে ভরে ওঠে রঙিন কমলায়। রাসেল জানান, এবছর আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে উৎপাদন কিছুটা কম হলেও কমলার স্বাদ ও গুণগত মান আগের বছরের তুলনায় আরও উন্নত। টকভাব কমে গিয়ে মিষ্টতা বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মাঝে বাড়তি সাড়া ফেলেছে।

বর্তমানে তার কমলা পাইকারি এবং খুচরা উভয় পদ্ধতিতে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে তিনি প্রতি কেজি কমলা ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনেক ক্রেতা সরাসরি বাগানে এসে কমলা কিনে নিচ্ছেন।

বাগান পরিদর্শনে আসা স্থানীয় বাসিন্দা ইমন হোসেন বাসসকে বলেন, ‘রাসেল কমলা চাষ করে সফল হয়েছে। তিনি প্রবাস থেকে ফিরে বেকার না থেকে কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। তার দেখাদেখি এলাকার অনেক তরুণই কৃষিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রতি আগ্রহী হবে।’

আরেক দর্শনার্থী মহসিন তালুকদার বলেন, ‘প্রবাসী যুবক রাসেল খুব সুন্দর একটি কমলার বাগান তৈরি করেছে। আমরা সরাসরি বাগান দেখতে এসেছি। এবছর প্রচুর কমলা হয়েছে, স্বাদও বেশ ভালো।’

বাগানে ঘুরে আসা অন্য ক্রেতারা বলেন, ‘ফরমালিনমুক্ত ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কমলা পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকায় আমরা এখানে আসি। বাগান ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাও অসাধারণ। অনলাইনেও এই কমলা বিক্রি হওয়ায় দূর-দূরান্তে মানুষও কিনছেন।’

কমলাচাষ সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রাসেল হোসেন বলেন, ‘১ বিঘা ৩৩ শতাংশ জমিতে ৬০টি কমলার গাছ ছিল। আবহাওয়ার কারণে কিছু গাছ নষ্ট হলেও বাকিগুলোতে ভালো ফলন এসেছে। গত বছর ফলন বেশি ছিল, এবার স্বাদ উন্নত হয়েছে। কমলার পাশাপাশি মাল্টা, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলও উৎপাদন করছি। সরকারি সহায়তা পেলে আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব হবে।’

শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত চারা বিতরণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহযোগিতা এবং কৃষি ঋণের ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই অঞ্চলে সাইট্রাস ফলচাষ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’

স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিবচরে মাল্টা, কমলা ও লেবুসহ বারোমাসি ফলচাষের পরিমাণ বাড়ছে। রাসেলের সফলতা তরুণ সমাজকে কৃষির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে। তার বাগান শুধু পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করেনি, বরং এলাকায় কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগের নতুন অনুপ্রেরণাও জুগিয়েছে।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : ডিসেম্বর ৭, ২০২৫ ৯:৪০ পূর্বাহ্ন
বন সুন্দরি কুল চাষে কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন পটুয়াখালীর আবু জাফর
কৃষি বিভাগ

পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলায় বন সুন্দরি কুল চাষ করে কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন যুব উদ্যোক্তা আবু জাফর (৩৫)। জীবিকার প্রয়োজনে শুরুতে ছোটখাটো ব্যবসা করলেও পরে নিজের আগ্রহ, শ্রম ও নিষ্ঠাকে সঠিক জায়গায় কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন সম্ভাবনাময় কুলচাষের সমন্বিত কৃষি মডেল।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার জৌতা গ্রামের দাখিল মাদরাসা শিক্ষক মো. ইসাহাকের মেধাবী পুত্র আবু জাফর মাদরাসা লাইন থেকে এমএ পাস করে বাউফলের কৃষিখাতে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। এমএ পাস করার পর এ এক অন্যরকম পথচলা বেছে নিয়েছেন তিনি।

সরেজমিনে উপজেলার জৌতা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় যুব উদ্যোক্তা আবু জাফর কুল বাগান পরিচর্যা করছেন। এসময় বাসসকে তিনি জানান, কৃষির প্রতি তার আগ্রহ জন্মায় তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে। তিনি বলেন, ইউটিউবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষির উন্নতি দেখে উৎসাহিত হই। ভাবলাম, আমাদের দেশেই তো অনেক সম্ভাবনা। পরে সিদ্ধান্ত নিলাম কুল চাষ করব। সেই সিদ্ধান্তই আজ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে তিনি কুল চাষের পাশাপাশি ধান, পেয়ারা এবং বিভিন্ন পুষ্টিসমৃদ্ধ মৌসুমি ফল চাষ করছেন। গত বছর কুল বিক্রি করে দেড় লাখ টাকা লাভ করেছেন জাফর। এবার তিনি আশা করছেন, তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার কুল বিক্রি করতে পারবেন। পাইকারি দরে প্রতি কেজি ১২০ টাকা এবং খুচরা দরে ১৫০ টাকা মূল্য পাচ্ছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘পরিশ্রম করলে কৃষিতে লাভ হয়—এটা এখন নিজ চোখে দেখছি।’

তিনি জানান, আমার পরিবারে ছয়জন সদস্য। এই কয়েক বছরের কৃষির আয়ের মাধ্যমে পরিবারের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে পরিবারের সবাই, বিশেষত মা তার কৃষিকাজকে খুব একটা ভালোভাবে নেননি। ‘মা আমাকে বলেছিলেন—তোমাকে লেখাপড়া করালাম এই মাইনদারি (চাষাভুষা) কাজ করার জন্য? পরে যখন দেখলেন কৃষিতেই আমার সফলতা, তখন তিনি বলেন—তুমি এগিয়ে যাও, দোয়া করি। এখন সবাই আমাকে সমর্থন করে বলে জানান তিনি।

আবু জাফর জানান, তিনি ৫০ শতাংশ জমিতে বন সুন্দরি জাতের কুল চাষ করছেন। উন্নত জাত, যত্ন ও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে ফলনও বেশ ভালো হচ্ছে। তিনি স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট—এসএসিপি (SSACP-RAINS) এর আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সহায়তা পেয়েছেন বলেও জানান।

জাফরের দাবি, কৃষি অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি বাগান পরিচর্যা, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমন এবং বাজারসংযোগ বিষয়ে আধুনিক জ্ঞান লাভ করেছেন। এতে তার ফসলের উৎপাদন বেড়েছে এবং বাজারজাতকরণ সহজ হয়েছে।

জৌতা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, স্থানীয় মানুষজন জাফরের কৃষি উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তারা মনে করেন, তার সাফল্য দেখে এলাকার আরো অনেক তরুণ কৃষির প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষক রিপন হাওলাদার বলেন, জাফর ভাইকে আমরা নিয়মিত দেখি বাগানে কাজ করতে। তিনি পরিশ্রমী মানুষ। এখন তার বাগান দেখে মনে হয় মন দিয়ে কেউ কিছু চেষ্টা করলে কৃষিতে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আরেক কৃষক শাহে আলম বলেন, আগে আমাদের গ্রামে কুলের বাগান তেমন ছিল না। এখন জাফরের সফলতা দেখে অনেকে কুলের চাষ করার কথা ভাবছে। স্থানীয় দোকানদার রাসেল জানান, জাফর ভাইয়ের কুল এলাকার বাইরে থেকে লোক এসে কিনে নিয়ে যায়। এতে আমাদের বাজারও চাঙ্গা হয়।

স্কুল শিক্ষক মহিউদ্দীন তালুকদার বলেন, ‘জাফরের মতো একজন শিক্ষিত যুবক কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে সফল হওয়ায় আমরা গর্বিত। শ্রম ও নিষ্ঠাকে কাজে লাগিয়ে কৃষিখাতে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সফল যুব উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন তিনি।

বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, ‘জৌতা গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আবু জাফর আধুনিক কৃষির একটি সফল উদাহরণ। আমরা নিয়মিত তাকে কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে থাকি। বন সুন্দরি জাতের কুল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সঠিক পরিচর্যা করলে প্রতি বছরই যে ভালো ফলন পাওয়া যায়, তা সেই কাজটাই জাফর করে দেখিয়েছেন।’

তিনি বলেন, বাউফলে কুল চাষের সম্ভাবনা দিনদিন বাড়ছে। আমরা চাই এ ধরনের উদ্যোগ আগামী দিনে আরো তরুণদের কৃষিতে যুক্ত করুক।

জাফর জানান, তার লক্ষ্য বাণিজ্যিকভাবে আরও বড় পরিসরে কুল চাষ করা। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষিতে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি আশা করেন, সরকারি সহায়তা ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতা থাকলে এ অঞ্চলের কৃষিচিত্র আরও বদলে যাবে।

তার ভাষায়, ‘আমি শুধু নিজের উন্নতি চাই না। চাই গ্রামের মানুষ কৃষিকে গুরুত্ব দিক। কৃষিই আমাদের শক্তি। আমি চাই একদিন জৌতা গ্রাম হবে কুল চাষের জন্য পরিচিত একটি মডেল এলাকা।’

শ্রম, চেষ্টা এবং দৃঢ় মনোভাব থাকলে কৃষিতে সফলতা অর্জন সম্ভব—এ কথার বাস্তব প্রমাণ উপস্থাপন করে যেন সামনে এগিয়ে চলেছেন বাউফলের এই তরুণ উদ্যোক্তা আবু জাফর।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : নভেম্বর ২৭, ২০২৫ ৪:০৪ অপরাহ্ন
গ্রীষ্মকালীন উচ্চ ফলনশীল টমেটো চাষে সফল জীবননগরের কৃষকরা
কৃষি বিভাগ

মাচা পদ্ধতিতে গ্রীষ্মকালীন উচ্চ ফলনশীল টমেটো চাষ করে ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে জেলার জীবননগর উপজেলার টমেটো চাষিরা। অল্প সময়ে বেশি লাভজনক হওয়ায় গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষে তাদের আগ্রহ বাড়ছে। এদিকে বাজারে থাইল্যান্ডের উচ্চ ফলনশীল বর্ষা, কুইন ও বারি-৮ জাতের টমেটোর চাহিদা থাকায় চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। ৪ মাসের এ আবাদে খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের বিঘা প্রতি লাভ হয় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। প্রতি বিঘায় উৎপাদন ১০০ থেকে ১১০ মণ টমেটো।

জীবননগর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা স্বল্পমেয়াদে উচ্চ ফলনশীল টমেটো চাষ করছেন। বর্ষা কুইন জাতের অধিক ফলনশীল এ টমেটো গাছ রোপণের ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিক্রির উপযোগী হয়। এই জাতের টমেটোর সাইজ বেশ বড় হয়। এ কারণে অন্য জাতের টমেটোর চেয়ে বেশি দরে বিক্রি হয়। শীত এগিয়ে আসায় বর্তমান বাজারে টমেটোর চাহিদা বেড়ে গেছে। জুন-জুলাই মাসে গ্রীস্মকালীন হাইব্রিড জাতের টমেটোর চারা রোপণ করা হয়। রোপণের ২ মাস পর অক্টোবর মাস থেকে এটা বাজারজাত করা হয়। বর্তমানে বাজারে এ টমেটোর পাশাপাশি শীতকালীন টমেটো উঠতে শুরু করেছে।

উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাড়ান্দী গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমি প্রতিবছর হাইব্রিড টমেটো চাষ করি। এবার একবিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছি। মাচা পদ্ধতিতে টমেটো চাষে করলে একদিকে যেমন : ফলন বেশি পাওয়া যায়, অন্যদিকে টমেটো নষ্ট হয় না বললেই চলে। এ পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করলে কীটনাশক, সার ও সেচ দেওয়া সহজ হয়। টমেটো উত্তোলন, বাগানের মধ্যে চলাফেরা এবং পরিচর্যা করতেও সুবিধা হয়।

তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করতে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত বিক্রি করে টাকা ঘরে তুলেছি প্রায় ২ লাখ টাকা। বর্তমানে জমিতে যে পরিমাণ টমেটো আছে সেটা বিক্রি করে আরো লাখ টাকা পাবো বলে আশা করছি।’

টমেটো চাষি তরিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, মাচা পদ্ধতিতে ৩ বিঘা জমিতে থাইল্যান্ড হাইব্রিড, বর্ষা কুইন টমেটো চাষ করেছি। বাজারে বর্ষা কুইন টমেটো প্রতিকেজি ১০০-১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তিন বিঘা জমি চাষে খরচ হয়েছে ৪ লাখ টাকা। এ পর্যন্ত ৫ লাখ টাকার টমেটো বিক্রি করেছি। মাঠে যে পরিমাণে টমেটো আছে সেটা বিক্রি করলে ৪ লাখ টাকা পাবো বলে আশা করছি।

তিনি বলেন, ‘জুন মাসে হাইব্রিড বর্ষা কুইন টমেটোর বীজ সংগ্রহ করি। এরপর পাতু দিই। পাতু দেওয়ার ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে বেডে চারা লাগানোর উপযোগী হয়। এবার আমি টমেটোর চারা বিক্রি করেও ৮০ হাজার টাকা লাভ করেছি। ’

চাষি আশরাফুল বলেন, ‘আমি বর্ষা কুইন টমেটো চাষ করেছি, দেড় বিঘা জমিতে দেড় বিঘা টমেটো আবাদে চারা লেগেছে সাড়ে ৪ হাজার পিস। এখন পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলন ভালো হয়েছে। ১ বিঘায় ১২০ মণ টমেটো পাওয়া যাবে।’

জীবননগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা পাভেল রানা বাসসকে বলেন, ‘উপজেলায় গ্রীষ্মকালীন বর্ষা কুইন টমেটো চাষ হয়েছে। এ জাতের টমেটো অধিক ফলনশীল হওয়ায় কৃষকেরা বেশি দরে বিক্রি করতে পারছে। এতে বেশি লাভ হচ্ছে। আগামীতে তারা যাতে আরো বেশি জমিতে বর্ষা কুইন জাতের টমেটো চাষ করতে পারে তার জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।’

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপর-পরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, জেলার ৪ উপজেলার মধ্যে জীবননগরে টমেটোসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ বেশি হয়। এবার ৩২ বিঘা জমিতে উচ্চ ফলনশীল বর্ষা, কুইন ও বারি-৮ জাতের টমেটোর চাষ হয়েছে। জুন-জুলাই মাস এ জাতের টমেটো রোপণের উপযুক্ত সময়। এ আবাদে যেমন : খরচ বেশি হয়, লাভের পরিমাণটাও অনেক বেশি থাকে। বিঘাপ্রতি ফলন হয় ১১০ থেকে ১১৫ মণ।

তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ১ হাজার ১০০ বিঘা জমিতে শীতকালীন টমেটো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : নভেম্বর ২৪, ২০২৫ ৯:০৫ পূর্বাহ্ন
কৃষি প্রতিবেশ সুরক্ষায় জৈব কৃষি সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি: বিশেষজ্ঞরা
কৃষি বিভাগ

দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর উদ্যোগে আজ ‘বাংলাদেশে ফসলের উৎপাদন হ্রাস না করে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জৈব কৃষিতে রূপান্তর’ শীর্ষক এক পলিসি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের লাগামহীন ব্যবহার মাটির উর্বরতা হ্রাস, পরিবেশ দূষণ, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছে।

সভাপতির বক্তব্যে পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বলেন, আমাদের কৃষকরা অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিব্যবহার কমাতে কৃষকদের সামাজিক আচরণ পরিবর্তনে আমাদের কাজ করতে হবে। জৈব কৃষি পদ্ধতিতে (অ্যাগ্রোইকোলজিক্যাল) উৎপাদন কমে না বরং ক্ষেত্রবিশেষে উৎপাদন বাড়ে। তবে জৈব কৃষি সম্প্রসারণে আমাদের একটি রোডম্যাপ করা দরকার। এটি রাতারাতি সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, এক সময় দেশের কৃষকরা উৎপাদন বাড়াতে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সারের ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছিল। কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নিশ্চিত করতে জৈব কৃষি পদ্ধতির বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. বেগম সামিয়া সুলতানা বলেন, বর্তমানে দেশব্যাপী মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ল্যাবে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থার আওতাভুক্ত কৃষকরা সহজে মাটি পরীক্ষা করে সার সুপারিশ কার্ড সংগ্রহ করতে পারে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. শেখ তানভীর হোসেন।

তিনি বলেন, দেশে গত ৫০ বছরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটি ও পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। গত অর্থবছরে সরকার মোট ২৪ হাজার কোটি টাকা কৃষিতে ভর্তুকি দিয়েছে, যার ৭৫ শতাংশই ব্যয় হয়েছে রাসায়নিক সারে।

এছাড়া, খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবেশ, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত অপ্রদর্শিত ব্যয় দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি জাতীয় কৃষি নীতি পুনর্বিবেচনা, নীতিগত দ্বৈততা দূরীকরণ এবং জৈব কৃষি সম্প্রসারণে নীতি কাঠামো প্রণয়নের সুপারিশ এবং জৈব সার উৎপাদনে বৃহত্তর বিনিয়োগে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কৃষি সম্প্রসারণে নিয়োজিত গবেষক এবং কৃষিখাতে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : নভেম্বর ১৬, ২০২৫ ৯:৪৯ পূর্বাহ্ন
সরকারের আরও বেশি আমন ধান কেনার আহ্বান রংপুরের কৃষকদের
কৃষি বিভাগ

কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে চলতি আমন মৌসুমে সরকারকে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে চালের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ ধান কেনার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের নেতারা ।

এবার আমন মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ৫০ হাজার টন ধান, ৬ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

কৃষক নেতারা বলেন, ৬ লাখ টন চালের তুলনায় মাত্র ৫০ হাজার টন ধান কেনা খুবই কম। কৃষকরা ধান উৎপাদন করেন, চাল নয়। তাই সরকারের উচিত তাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

বৃহস্পতিবার বিকেলে কাচারী বাজারে সংগঠনের রংপুর জেলা শাখা আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে এই আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে বক্তারা প্রতিটি বাজারে ধান সংগ্রহ কেন্দ্র চালু এবং চালের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ ধান কেনার দাবি জানান।

কৃষক নেতারা বলেন, সরকার ২০ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি কেজি ধান ৩৪ টাকা এবং চাল ৫০ টাকা দরে কেনার পরিকল্পনা করেছে।

তারা আরও দাবি জানান, আলু চাষিদের ক্ষতিপূরণ ও সহজ ঋণ প্রদান এবং রংপুর অঞ্চলে বিশেষায়িত সরকারি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করতে হবে।

সংগঠনটির জেলা আহ্বায়ক কমরেড আনোয়ার হোসেন বাবলুর সভাপতিত্বে সমাবেশে কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক কমরেড আহসানুল আরেফিন টিটু, কৃষক প্রতিনিধি রানা মিয়া ও আবুল হোসেন বক্তব্য রাখেন।

কৃষক নেতারা বলেন, সরকার ২০ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতি কেজি ধান ৩৪ টাকা এবং চাল ৫০ টাকা দরে কেনার পরিকল্পনা করেছে।

আহসানুল আরেফিন টিটু বলেন, চালের তুলনায় এত অল্প পরিমাণ ধান কেনার ঘোষণাকে আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।

তিনি বলেন, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে এবং বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে সময়মতো বোরো ও আমন ধান সংগ্রহ নীতি প্রণয়ন জরুরি।

তিনি প্রস্তাব দেন, সরকার যেন কৃষকদের কাছ থেকে আরও বেশি ধান কিনে এবং সংগ্রহকৃত ধান নির্ধারিত হারে মিলারদের দিয়ে ভাঙিয়ে নেয়, যাতে সরকার বাজারে ভর্তুকি মূল্যে চাল সরবরাহ করতে পারে। এতে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙবে এবং ভোক্তারা সুরক্ষিত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আলু চাষিদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, গত বছর কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ করতে পারেননি। এর ফলে শত শত টন আলু ঘরে পচে যায়।

সমাবেশ শেষে সংগঠনটি তাদের দাবিসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে জেলা প্রশাসক এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেয়।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : নভেম্বর ৫, ২০২৫ ৪:৫৮ অপরাহ্ন
রংপুর অঞ্চলে ধানক্ষেতের পোকা দমনে জনপ্রিয় হচ্ছে পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি
কৃষি বিভাগ

রংপুর কৃষি অঞ্চলে ধানক্ষেতের ক্ষতিকর পোকা দমনে কীটনাশক ব্যবহারের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

পার্চিং পদ্ধতিতে কৃষকরা ধানক্ষেতের ওপর নির্দিষ্ট দূরত্বে বাঁশের খুঁটি বা গাছের ডাল স্থাপন করেন। সেখানে শিকারি পাখিরা বসে ধানগাছের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলে। এতে ফসল সুরক্ষা পায় এবং কীটনাশকের ব্যবহারের বেশি প্রয়োজন হয় না।

পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষার এই পদ্ধতিকেই পার্চিং বলা হয়। রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (ডিএই) কৃষিবিদ মুহাম্মদ আলী বলেন, পার্চিং পদ্ধতি ব্যয়বিহীন এবং পরিবেশবান্ধব। রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী এ পাঁচটি জেলার আমন ধানের জমিতে ডেড পার্চিং, লাইভ পার্চিং ও হালকা ফাঁদ পদ্ধতি গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, কৃষকরা ধানগাছকে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। ফলে উন্নত ধানের ফলন হচ্ছে।

তিনি বলেন, বোরো ও আমন ধানগাছে পোকা আক্রমণ প্রতিরোধে কৃষকরা সবচেয়ে সহজ ও পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি গ্রহণ করে ব্যাপকভাবে উপকৃত হচ্ছেন। এতে পোকা দমনে খরচ কম হচ্ছে, কীটনাশকের ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসম্মত ধান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

চলতি মৌসুমে কৃষকরা ৬ লাখ ২১ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে পোকা দমনে পার্চিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।

রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার ৩,৬৯,১৬০ হেক্টর আমন ধানক্ষেতে কৃষকরা ইতোমধ্যে বাঁশের খুঁটি বা গাছের ডাল স্থাপন করেছেন এবং এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এই অঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে এবং ব্যাপক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এতে কৃষকরা কম খরচে, কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি গ্রহণ করে বোরো ও আমন ধানগাছকে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করছেন এবং স্বাস্থ্যসম্মত ধান উৎপাদন করছেন।

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের পিএইচডি ফেলো মো. মামুনুর রশীদ বলেন, কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি। এর ফলে অনেক দেশীয় মাছ, উপকারী পোকা ও পাখি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এতে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পরিচালিত উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি কৃষকদের ধানগাছকে পোকা আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এবং পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করে অর্থ সাশ্রয় করতে প্রশিক্ষিত করছে। কারণ এই পদ্ধতির প্রয়োগ বাস্তবিক অর্থে ফলপ্রসূ ও লাভজনক।

মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ধানক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতির ব্যবহার অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত সুবিধা রয়েছে। এ পদ্ধতিতে বাঁশের খুঁটি বা গাছের ডাল ব্যবহার করে শিকারি পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়, যারা ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলে। এতে কীটনাশকের প্রয়োজন কমে যায় এবং স্বাস্থ্যসম্মত ধান উৎপাদন সম্ভব হয়।

বাসসের সঙ্গে আলাপকালে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামের কৃষক হামিদুর রহমান এবং সদর উপজেলার কাথিহারা গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী বলেন, তারা প্রতি বছর তাদের বোরো ও আমন ধানক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতি গ্রহণ করছেন।

ইসহাক আলী বলেন, ধানক্ষেতে পোকা দমনে পার্চিং পদ্ধতি গ্রহণ করে কীটনাশকের খরচ কমিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ধান উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার হচ্ছে।

তারাগঞ্জ উপজেলার দোলাপাড়া গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন এবং কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া গ্রামের কৃষক বদিউল আলম বলেন, তারা প্রতি বছর ধানক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে সুফল পাচ্ছেন।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : নভেম্বর ২, ২০২৫ ৯:২২ পূর্বাহ্ন
নওগাঁয় হঠাৎ বৃষ্টিতে আমন ধানসহ সবজিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা
কৃষি বিভাগ

কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে নওগাঁর বিভিন্ন উপজেলার আমন ধানসহ শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে আজ শনিবার সকাল পর্যন্ত একটানা বৃষ্টিতে নিচু এলাকার ধানক্ষেত তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সরিষা, ফুলকপি, আলু, পেঁয়াজের বীজতলা, গাজর ও অন্যান্য সবজির জমি। এতে স্থানীয় কৃষকরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কার্তিক মাসে সাধারণত হালকা বৃষ্টি হয়। তবে এ বছরের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক।

এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আলু আবাদের জন্য কোথাও কোথাও প্রস্তুত করা হয়েছিল জমি।

কোথাও সদ্য রোপণ করা হয়েছে বীজ। বৃষ্টিতে বেশিরভাগ জমিতেই পানি জমেছে। ফসল বাঁচাতে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা। শুধু আলু ক্ষেত নয়, আগাম জাতের শীতকালীন ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, মরিচ, বেগুন, মূলাসহ বিভিন্ন শাক-সবজির গাছও মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। যে-সব ক্ষেতের সবজি এখনো ভালো রয়েছে, তা রক্ষায় প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষকেরা। এ ছাড়াও মাঠের আধা-পাকা ধান হেলে পড়েছে। গড়াগড়ি খাচ্ছে পানিতে।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কয়েদিনের বৃষ্টিতে ফসলি জমিতে পানি জমেছে। যে-সব জমিতে আগাম আলু বপন করা হয়েছে, সেসব জমিতে পানি জমায় রোপণ করা আলুর বীজ পচে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে আলু চাষিদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এ ছাড়াও রোপা আমন ধান ও আগাম শীতকালীন শাক-সবজিরও ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলার মান্দা উপজেলার এনায়েতপুর গ্রামের কৃষক অমল চন্দ্র সরকার বাসসকে বলেন, ‘গত ২৫-৩০ বছরে কার্তিক মাসে এত বৃষ্টি দেখিনি। প্রবল বৃষ্টিতে আমার কয়েক বিঘা জমির আমন ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।’

মান্দা উপজেলার পশ্চিম নুরুল্লাবাদ গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল জানান, গেল বছর আলুর ভালো দাম না পাওয়ায় এ বছর ভাল লাভের আশায় আগাম আলু চাষ শুরু করেন কৃষকরা। তবে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে আলুর জমিতে পানি জমে। বৃষ্টির পানিতে একদিকে রোপণকৃত বীজ পচে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। অন্যদিকে অনাবাদি জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের পর বীজ রোপণ কবে করা যাবে তা নিয়েও সংশয়  দেখা দিয়েছে। শীতকালীন শাক-সবজির জমিতেও শিকড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পানি দ্রুত না নামলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকেরা।

তিনি আরো বলেন, ধান সবে পাকতে শুরু করেছিল। এখন গাছ নুয়ে পড়ে পানির নিচে গেছে। বোরো ধানে ক্ষতির পর এবার আমন চাষেও লোকসান গুনতে হবে।

নওগাঁ সদর উপজেলার বর্ষাইল এলাকার কৃষক রতন মোল্লা বাসসকে বলেন, সবেমাত্র আলুর বীজ রোপণ করেছি।

এরই মধ্যে বৃষ্টি। এখনও মাঝে মাঝে আকাশ মেঘে ঢেকে আসছে। ঝিরঝির করে বৃষ্টিও পড়ছে। মাটির নিচে রোপণ করা আলুর বীজ একটু পানি পেলে পচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্ষেতের অধিকাংশ আলু পচে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

নওগাঁ সদর হাপানিয়া এলাকার সুশীল মিস্ত্রি বলেন, ধান পাকতে শুরু করেছে। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় আমন ধানের গাছ মাটিতে নুয়ে গেছে। এখনো ফসলের ক্ষেতে অনেক পানি জমে আছে। দ্রুত পানি সরাতে না পারলে অনেক ক্ষতি হবে।

পত্নীতলার কৃষক সালেহ মামুন বলেন, ধান পাকতে শুরু করেছে। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় আমন ধানের গাছ মাটিতে নুয়ে গেছে। এখনো ফসলের ক্ষেতে অনেক পানি জমে আছে। দ্রুত পানি সরাতে না পারলে অনেক ক্ষতি হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হোমায়রা মন্ডল বাসসকে বলেন, হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিতে আমন ধান ও সবজি চাষে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন।

তিনি বলেন, বৃষ্টি হলেও ভারী বর্ষণ হয়নি। সবেমাত্র আলু রোপণ শুরু হয়েছে। যে-সব জমিতে আলু লাগিয়ে ৮-১০ দিন হয়েছে, সেগুলোর ক্ষতি হবে না। এছাড়া শীতকালীন সবজি ও ধানের খুব বেশি ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। ধানের জন্য বৃষ্টি কিছুটা আশীর্বাদ। ক্ষেত থেকে পানি সরে গেলে কোনো সমস্যা হবে না।

তিনি জানান, জেলায় এবছর আমন ধান চাষ হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার হেক্টর জমিতে। আগাম শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে ১ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমিতে। আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ হাজার হেক্টর জমিতে।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : অক্টোবর ২৬, ২০২৫ ৯:৪৬ পূর্বাহ্ন
নাটোরে আমনের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে
কৃষি বিভাগ

নাটোর জেলায় সমৃদ্ধির জানান দিচ্ছে আমনের মৌসুম। ৭৬ হাজার ৮৮৫ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে জেলায় ৭৬ হাজার ৯৯৭ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ করা হয়েছে। অর্থাৎ ১১২ হেক্টর অতিরিক্ত জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, খরিপ-২ মৌসুমে জেলায় রোপা আমনের মোট ৭৬ হাজার ৯৯৭ হেক্টর আবাদী জমির মধ্যে সর্বোচ্চ সিংড়া উপজেলায় আবাদ হয়েছে ২৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে।

এছাড়া বড়াইগ্রামে ১৬ হাজার ৭৫৪ হেক্টর, নাটোর সদর উপজেলায় ১০ হাজার ৬১০ হেক্টর, লালপুরে নয় হাজার ১৮৫ হেক্টর, বাগাতিপাড়ায় ছয় হাজার ৩৭৩ হেক্টর, গুরুদাসপুরে ছয় হাজার ৭৮০ হেক্টর এবং নলডাঙ্গা উপজেলায় তিন হাজার ৬৯৫ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ করা হয়েছে।

আবার আবাদী জমির মধ্যে ৭০ হাজার ৬৪৬ হেক্টরে উচ্চ ফলনশীল জাত, পাঁচ হাজার ৭৪৬ হেক্টরে হাইব্রিড এবং ৬০৫ হেক্টরে স্থানীয় জাতের আমন ধান চাষ করা হয়েছে।

সূত্রটি আরও জানিয়েছে, কৃষকদের প্রণোদিত করতে রাজস্ব খাতের আওতায় ২০২ জন কৃষককে এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ছয়জন কৃষককে তাদের এক বিঘা জমি চাষে প্রয়োজনীয় বীজ ও সার সরবরাহ করে প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া পার্টনার প্রকল্পের আওতায় ১৬ জন কৃষকের দুই একর জমিতে প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা হয়েছে। এসব খামারে উপকারভোগী কৃষকবৃন্দ ছাড়াও পাশের এলাকার কৃষকবৃন্দ ব্রি-৯০, বিনা-২৬ ছাড়াও প্রায় নতুন উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্রি-১০৩ জাতের ধানের উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন নিবিড়ভাবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার দু’ধারে, বিলের মধ্যে এখন শুরু সবুজ ধানের গাছ আর সদ্য সোনালী বর্ণ ধারণ করা ধানের সমারোহ। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ-সোনালীর মাঠ সমৃদ্ধির জানান দিচ্ছে। সবুজ ক্ষেতে গাছের পাতা ভেদ করে ধানের গুচ্ছ কুশি উঁকি দেওয়ার অপেক্ষায় আছে। আর আগাম জাতের ধানের ক্ষেত সোনালী বর্ণ ধারণ করে ধানের ভাড়ে নুব্জ হয়ে পড়ছে। এসব ধান দুই সপ্তাহ পর থেকে কাটা শুরু হবে। তবে বিলের চাষাবাদ দেরিতে শুরু হওয়ায় এসব ধান কাটাও হবে দেরিতে। চলতি মৌসুমে ধানের ফলন চার লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।

হালতি বিল অধ্যুষিত বাশিলা এলাকার কৃষক এম আরিফুল ইসলাম চলতি মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে রোপা আমন ধান আবাদ করেছেন। এর মধ্যে তিন বিঘা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে বিনষ্ট হয়েছে। অবশিষ্ট দুই বিঘাতে আছে উচ্চ ফলনশীল ব্রি-৭৫ এবং স্থানীয় জাতের জিরাশাইল।

নাটোর সদর উপজেলা পৌরসভার মোহনপুর এলাকার আদর্শ কৃষক আহমেদুল কবীর দুই বিঘাতে হাইব্রিড ও দুই বিঘাতে শম্পাকাটারি ধান আবাদ করেছেন। উঁচু জমি হওয়াতে আগাম ধান করতে পেরেছেন তিনি। আগামী সপ্তাহে ধান কাটা যাবে বলে জানান।

শষ্য ভাণ্ডার খ্যাত চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়া উপজেলার আদর্শ কৃষক জুলফিকার আনাম তারা কুমিড়া এলাকায় সতের বিঘা জমিতে রোপা আমন চাষ করেছেন। চাষাবাদকৃত জমির বেশীর ভাগটাই উন্নতমানের সুগন্ধি ধান। কিছুদিনের মধ্যে ধানের কুশি বের হবে বলে জানান কৃষক তারা। এবারের চাষাবাদে আবাদের পরিবেশ আর আবহাওয়া অনুকূলে, ফলনও ভালো হবে বলে আশাবাদী তিনি।

সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ হাসান বলেন, সমৃদ্ধ ফলনের জন্য কাজ করছে কৃষি বিভাগ। উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তাবৃন্দ ব্লকগুলোতে সরেজমিনে যেয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বাসস’কে বলেন, উন্নত জাতের বীজের প্রচলন, সহজলভ্যতা এবং ধানের চড়া দামের কারণে কৃষকরা আমন ধানের আবাদ বাড়িয়েছেন। প্রত্যাশিত ফলন পেতে কৃষি বিভাগ নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ করছে। আশাকরি এবারের ফলন হবে আশাতীত।

শেয়ার করুন

প্রকাশ : অক্টোবর ১৩, ২০২৫ ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন
খুলনায় টেকসই কৃষিতে আশার আলো দেখাচ্ছে সবুজ সার
কৃষি বিভাগ

খুলনার কৃষকরা রাসায়নিক সারের টেকসই বিকল্প হিসেবে সবুজ সার গ্রহণ করছেন। এতে উপকূলীয় এলাকায় পরিবেশবান্ধব এবং কম খরচে চাষাবাদে নতুন আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দিক-নির্দেশনায় কৃষকরা রাসায়নিক ব্যবহার না করে সফলভাবে ধান চাষে সবুজ সার প্রয়োগের মতো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি নতুন করে ফিরিয়ে এনেছেন। এই পদ্ধতি কেবল মাটির স্বাস্থ্যেরই উন্নতি করে না, বরং উৎপাদন খরচ ও রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতাও হ্রাস করে।

বটিয়াঘাটা উপজেলার শুড়িখালী গ্রামের কৃষক মো. শাহজাহান হোসেন এ বছর ৭০ শতাংশ জমিতে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার না করেই রোপা আমন ধান চাষ করেছেন। জমিতে রাসায়নিকের বদলে তিনি সবুজ সার হিসেবে ধৈইঞ্চা গাছ ব্যবহার করেছেন।

তিনি বলেন, বোরো ধান কাটার পর আমি ধৈইঞ্চা বীজ বপন করি। প্রায় ৪৫ দিনের মধ্যে গাছগুলো বেড়ে উঠলে সেগুলোসহ জমি চাষ করি।

শাহজাহান বাসস’কে বলেন, কোনো রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই আমার ধান ভালোভাবে বেড়ে ওঠে, যার ফলে আমার প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়।

পার্শ্ববর্তী গঙ্গারামপুর ও চক্রখালী গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ ও হারুন-উর-রশিদ এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন এবং আশাব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছেন।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সবুজ সার মাটিতে জৈব পদার্থ বৃদ্ধি করে এবং নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ করে। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর জমির ধৈইঞ্চা গাছ ৬০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত নাইট্রোজেন প্রদান করতে পারে। এটি ইউরিয়া সারের দারুণ বিকল্প।

কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, প্রথমবারের মতো আমি ইউরিয়া ছাড়াই ধান চাষ করতে দেখলাম এবং ফলনও ভালো হচ্ছে। আমি আগামী বছর ১২ বিঘা জমিতে ধৈইঞ্চা বুনে তারপর চাষ করার পরিকল্পনা করছি।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জীবনানন্দ রায় বলেন, লবণাক্ততা এবং দীর্ঘমেয়াদী রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। আমরা ধৈইঞ্চা চাষ পদ্ধতিকে উৎসাহিত করছি। ইতোমধ্যেই শুড়িখালীতে প্রায় ১১০ বিঘা জমি সবুজ সারের মাধ্যমে চাষের আওতায় আনা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খুলনা জোনের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে ৩ হাজারেরও বেশি কৃষক ৪৭৪ হেক্টর জমিতে ধৈইঞ্চা বুনেছিলেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, তরমুজ চাষের পর একটি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় আমরা ২১০ জন কৃষককে ৫ কেজি করে ধৈইঞ্চা বীজ বিতরণ করেছি। ৪৫ দিন পর গাছগুলো চাষের মাধ্যমে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে উৎপাদন খরচ কম হয় এবং ভালো ফলন নিশ্চিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ বছরে ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহার করে। যার মধ্যে ২৬ থেকে ২৭ লাখ টন ইউরিয়া সার। এতে সরকারের ওপর ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির বোঝা চেপে বসে। সবুজ সার এই খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে এবং পরিবেশও ভালো হয়।

শেয়ার করুন

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

ads

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ads

ফেসবুকে আমাদের দেখুন

ads

মুক্তমঞ্চ

scrolltop